Monday 24 September 2012

অভিশপ্ত ঘড়ি



কেরোসিন স্টোভ জ্বেলে ভাত আর আলু একসঙ্গে সেদ্ধ করতে দিল ধনু। হঠাৎ করে মাছ খেতে ইচ্ছে করলো আমার। আবদার পাড়লাম, খালি ভাত আর আলু সেদ্ধ খাওয়াবি? মাছ খাইতে মন চায়, তোদের এই নদীতে মাছ নেই?
ধনু চোখ টেরা করে তাকালো, তারপর হেসে ফেললো, তোর দেখি খায়েশ কম না। এই রাতে মাছ ধরবো কেমনে?

আমি জানি মাছ খেতে ইচ্ছে করাটাই সার। রাতের বেলা মাছ ধরা অসম্ভব। কথার কথা বলা। কিন্তু ধনু ভাত চুলায় দিয়ে নৌকার পেছনে চলে গেল। ওখান থেকে দুটো বাঁশ বের করলো। বাঁশ দুটোতে গামছামতো কিছু বাঁধা আছে। আমি অন্ধকারে বুঝতে পারলাম না কি ওটা। জাল নাকি? ধনু বললো, একটা বুদ্ধি আসছে মাথায়। নদীর ওইপাশে ছোট খাড়ি আছে। এসব খাড়িতে বড় বড় চিংড়ি মাছেরা সাঁতার কাটে সন্ধ্যেবেলা। সেরকম পাওয়া গেলে নদীতে নামতে হবে না, ছেঁকেই তুলে নেয়া যাবে কয়টা। চল নৌকাটা কাছে নিয়ে যাই। নৌকা খাড়িটার কাছে গেলে সে বাঁশ দুটোকে ক্রস করে কায়দামতো পানিতে ফেললো। আবার তুললো, আবার ফেললো। এরকম বেশ কয়েকবার করার পর, ধনু চিৎকার করে উঠলো। ফাই ফাই ফাইদিইইইইই ........আমি খুশীতে লাফ দিলাম। চিংড়ী পাইছস? ধনু বললো, আরে না চিংড়ীর বদ্দা। একটা আস্ত সাপ ধরছে জালে। দারুন রান্না হবে রে। আমি বললাম, সাপ??? তুই সাপ খাবি?? ইয়াক!!
সে অবাক হয়ে তাকালো, তোরা বাঙালীরা খাওয়ার মজাই বুঝলি না। তোর চিংড়ির চেয়ে এই সাপের তরকারী অনেক মজার। খেয়েই দেখ না আগে। আমি বলি, তোর সাপ তুই খা ব্যাটা, চিংড়ী পাওয়া না গেলে আমি আলুসেদ্ধ দিয়েই খাবো। ধনু হেসে বলে, চিন্তা করিস না। এখানে চিংড়িও পেয়ে যাবো দুয়েকটা। সাপটাকে নৌকার সাথে এক আছাড় দিয়ে খতম করে ছুরি দিয়ে মাথা কেটে নদীতে ফেলে দিল। শরীরের বাকী অংশটা নৌকার একপাশে ছুড়ে মারলো। আবার খাঁড়িতে খোঁজ দ্য সার্চ চললো। কয়েকবারের চেষ্টার পর আবারো ধনুর চিৎকার। ফাই ফাই ফাইদিইইইইইইই.........আমি মনে মনে বিরক্ত হয়ে বললাম, ব্যাটা আরেকটা সাপ পাইছে। না, এবার সত্যি সত্যি চিংড়ী। সাইজ দেখে বাগদা চিংড়ি মনে হলো। চার পাঁচটা বড় বাগদা ত্রিং ত্রিং করে হাতপা ছুঁড়ছে জালের মধ্যে। হঠাৎ পোড়া গন্ধ নাকে যেতেই, হারেরেরেরে করে ধনু ছুটে গেল চুলার কাছে। সব গেছে পুড়ে। পোড়াভাতই খেতে হবে আজ। চাল নাই আর। কিন্তু চিংড়ির যে সাইজ তাতে ভাত না হলেও চলবে আমার। ধনুর চোখেও খুশীর ঝিলিক, সাপ দিয়েই পেট ভরাবে ব্যাটা। খাওয়া সেরে আমি চা বানালাম। টি ব্যাগ ছিল আমার। টিনের মগে চা নিয়ে ধনু ছইয়ের বাইরে চলে গেল। আমি চা খাওয়া শেষ করে সিগারেটে আগুন দিলাম। ধনুও হাত বাড়িয়ে নিল একটা। তারপর আনমনে কথা বলতে শুরু করে............  আমার বাবারা অনেক ভাই। এগারোজন। তার মধ্যে মাত্র একজন আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতো। মিজুক মার্মা। সেও খানিকটা বাবার মতো বাউন্ডুলে। কোথায় কোথায় উধাও হয়ে যেতো কিছুদিন পর পর। কি করতো কেউ জানতো না। আমার বয়স যখন ষোল সতেরো বছর, তখন একদিন এসে আমাকে নিয়ে শিকারে যাবার প্রস্তাব দিল। মা রাজী না, বাবাও মত দেয় না। কিন্তু আমি যাবার জন্য গোঁ ধরি। সবার নিষেধ অমান্য করে আমি মিজুকের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। আসলে শিকার হলো অজুহাত। মিজুক আমাকে অদ্ভুত একটা জায়গার গল্প করেছিল। সেখানে নিয়ে যাবার জন্য আমিই গোঁ ধরেছিলাম। বাবামা যেতে দেবে না বলে, শিকারের অজুহাত দিতে হয়েছিল। কিছুদূর নৌকা, কিছুদুর পায়ে হেঁটে, বেশ কয়েকদিন পর যে জায়গায় হাজির হই সেটা অন্যরকম জগত। বনজঙ্গল পাহাড় পর্বত সবই আমাদের মতো। কিন্তু কেমন যেন সুনসান গা ছমছম নীরবতা। কোথাও কোন শব্দ নেই। আমাদের পাহাড়ে যতই নির্জনতা থাকুক, পাখি গান গায়, পোকা গান গায়, ফড়িং উড়ে ফড়ফড় করে, কাটবেড়ালী লাফ দেয় গাছ থেকে গাছে। নানারকম শব্দে আলোড়িত থাকে গ্রাম। কিন্তু এই জায়গায় কোন শব্দ নেই। একদম চুপচাপ চারদিক। এমন নিঃশব্দ জগত আমি আর কখনো দেখিনি। দম বন্ধ করা নিস্তব্ধতা। পায়ের নীচে একটা শুকনো পাতা পড়লেও মচ করে শব্দটা অনেক দূরে চলে যায়। এত নিস্তব্ধতার কারণ কি? খানিকক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর পর আবিষ্কার করি, এখানে কোন পাখি নেই। একটাও না। শুধু পাখি না উড়ন্ত কোন প্রাণীই দেখা গেল না। এত সুন্দর একটা জায়গায় এই নীরবতাটা কেমন বেমানান। গায়ে কাটা দিল। এখানে নাকি জঙ্গলের ভেতর কোথাও একটা গীর্জা আছে। মিজুক শুনেছে ওই গির্জাটা কয়েকশো বছরের পুরোনো। পর্তূগীজ একদল তান্ত্রিক গির্জাটা নির্মান করেছিল। গির্জাটা উপাসনার কাজে যতটা ব্যবহার হয়েছে তার চেয়ে বেশী ব্ল্যাক আর্ট চর্চার কাজে। কিরকম চর্চা করতো একালের কেউ জানে না। কিন্তু এই অঞ্চলে নাকি কথিত আছে, ওরা এই গির্জা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে মানুষ দূরে থাক, পশুপাখিও পালিয়ে গেছে বন থেকে। শোনা যায় প্রধান পুরোহিত নাকি বাজপাখীর চেহারায় উড়ে বেড়াতো জঙ্গলে। উড়ন্ত যে কোন প্রাণী বলি দেয়ার নিয়ম ছিল ওদের। যদিও মানুষ বলি দেবার কথা শোনা যায়নি, তবু ভয়ে সব মানুষ এলাকা ছেড়ে পালায়। গত দূশো বছরে এখানে কোন বসতি হয়নি আর। এই দুর্গম অঞ্চলে বিদেশী কোন শক্তি পা দিয়েছে ভাবতে অবিশ্বাস্য লাগে। এই এলাকাটা কোন দেশের তাও নিশ্চিত না। এটা নাকি বার্মা ভারত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা। দুর্গমতার কারণে আদিকাল থেকেই সীমানা নির্ধারিত হয়নি এই অঞ্চলের। তিন দেশের আদিবাসী বিদ্রোহীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। গীর্জাটা কাদের দখলে আছে তাও জানা যায় না। কিন্তু এই জঙ্গলের কয়েক মাইলের মধ্যে আছে। মিজুক শুনেছে ওই গীর্জায় প্রাচীন কিছু ইউরোপীয় আসবাব আর সৌখিন দ্রব্য আছে। সৌখিন দ্রব্যগুলো কোনমতে হাত করতে পারলে অনেক দামে বিক্রি করা যাবে। আমাকে সাথে নিয়ে আসার ওটাও অন্যতম কারণ।

কিন্তু গীর্জা খোঁজা কতটা নিরাপদ? বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে পড়লে গুলি খেয়ে মরতে হবে। মিজুক অভয় দিল, আমাদের পরিচয়ও বিদ্রোহী। আমরা বাংলাদেশী বিদ্রোহী হিসেবে পরিচয় দেবো। ধরা পড়লে বলবো আমরা দেশ থেকে পালিয়ে এসেছি শান্তিবাহিনীতে যোগ দিতে। আন্দাজ করা যায় গীর্জাটার অবস্থান হবে পাখিবিহীন এলাকার ভেতরে। সুতরাং খুঁজতে হবে যেখানে পাখি নেই কেবল সেই এলাকায়ই। কিন্তু কতোবড় এই এলাকা? তাছাড়া এত বছর পরেও মন্দির এবং তার আসবাবগুলো সংরক্ষিত আছেই সেটা কি করে ভাবলো মিজুক। আমি সংশয়ে আছি তবু কিছু বললাম না মিজুককে। এতদূরে যখন এসেছি, খুঁজেই দেখি। দুদিন এলোপাথাড়ি চষে ফেললাম এলাকাটা। গীর্জা দূরে থাক, একটা জনপ্রাণীর দেখাও মেললো না। তৃতীয় দিন রান্নার জন্য লাকড়ি পাড়তে একটা বড় গাছে উঠেছি। গাছে উঠতেই চোখে পড়লো অদূরে ঘন একটা জঙ্গল, যেখানে অনেকগুলো গাছ জড়াজড়ি করে লতায় পাতায় সবুজের একটা স্তুপ তৈরী করেছে। বিশাল পরিধির জংলার সামনে খোলা এক ফালি প্রান্তর। এক মানুষ উচ্চ ঘাসে ছাওয়া। জঙ্গলের আকৃতিটা আমার চোখে সন্দেহ যোগালো। ওটার ভেতরেই কি সেই গীর্জা? গাছ থেকে নেমে মিজুককে ডাক দিলাম। মিজুক ছুটে এসে গাছে চড়লো। সে আনন্দে লাফ দিল। মোটামুটি নিশ্চিত এটাই সেই গীর্জা। কিন্তু জায়গাটা যদিও মাত্র দুশো গজ দূরে, কিন্তু এই ঘন জঙ্গল পেরিয়ে ওখানে পৌছানো অসম্ভব। হয়তো গত একশো বছরেও কারো পদার্পন পড়েনি ওদিকে। জঙ্গল কেটে ওটার কাছে যেতে যেরকম যন্ত্রপাতি লোকবল দরকার তার কিছুই নেই আমাদের। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে মিজুককে বললাম, যথেষ্ট হয়েছে। আর ভাল্লাগছে না। ভয়ংকর গীর্জাটার ভেতর মহামূল্যবান হীরক খন্ড থাকলেও আমি নিতে রাজী না। ফিরে যাই চলো। কিন্তু মিজুক এসেছে কেবল ওটা খুঁজে বের করার জন্য। সে ওটার ভেতরে না ঢুকে যাবে না। কিছু মানুষ এত গোঁয়ার ও লোভী হতে পারে। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে সম্পদ গড়তে চায়। আমাকে বললো, তোর ভালো না লাগলে ফিরে যা,আমি ওখানে ঢুকেই ছাড়বো। এখান থেকে একা ফেরার কথা ভাবাই যায় না। পথঘাট চিনি না, তাছাড়া ভয়ংকর এলাকা এটা। অশরীরী কোন ব্যাপার আছে এখানে। পরদিন একটা রাস্তা আবিষ্কার করা গেল। জঙ্গলটার ঠিক পেছনে পাহাড়টা নেমে গেছে অনেক ঢালুতে। ওইদিকে গিয়ে মিজুকের চিৎকার, পেয়ে গেছি। আমি দৌড়ে গিয়ে ঢালুর দিকে নেমে এগিয়ে গেলাম মিজুকের দিকে। এদিকটা খাড়াই বলে বোধহয় অরক্ষিত। কোন জঙ্গল নেই। গীর্জার ভগ্নপ্রায় কাঠামোটা দেখা যাচ্ছে এখান থেকে।

আর দেরী হলো না। হাতের ছোট ছুরি দিয়ে জঙ্গল কেটে সাফ করতে করতে এগোচ্ছি, এমন সময় একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। চোট লাগলো খুব। মিজুক ছুটে এল আমার কাছে। কিন্তু আমাকে না তুলে আমি যে পাথরে আছাড় খেলাম সেদিকে তাকিয়ে আছে। আমিও এতক্ষনে খেয়াল করলাম। তিনটা পাথর খাড়া দাঁড়িয়ে। ওটার উপর আরেকটা পাথর ছাদের মতো দিয়ে কিছু একটা তৈরী করা হয়েছে। একটা নয়। এদিক ওদিক ছড়ানো আরো অনেকগুলো। কি এগুলো? বসার স্থান? পূর্তগীজ ওঝারা বসে চা খেত বিকেলবেলা? মিজুক আমার সংশয় দূর করে বললো, এগুলো কবর। এটা একটা কবর খানা। কথাটা বিশ্বাস করতে আপত্তি রইল না। এরকম কবর কাদের হতে পারে। খ্রিষ্টানদের তো এরকম কবর থাকার কথা না। এই প্রশ্নের উত্তর দেবার কেউ নেই ওখানে। সুতরাং আমরা গীর্জায় প্রবেশ করার জন্য উঠলাম। গীর্জটা এককালে যে খুব সমৃদ্ধ ছিল কাঠামোই বলে দিচ্ছে তা। কিন্তু গীর্জাপতিদের উদ্দেশ্য এখনো পরিষ্কার হলো না। কখনো হবেও না। গীর্জার পেছনদিকে দরোজা নেই, একটা ফোকর মতো আছে ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালে ওটা দিয়ে একটা শেয়াল সহজেই ঢুকতে পারে। মানুষেরও ঢুকতে অসুবিধা হবার কথা নয়। কিন্তু ফোকরের ভেতরে জমে থাকা অন্ধকার আমাকে না না করতে লাগলো। ইচ্ছে করছে পালাই। এই অশুভ মন্দির থেকে পালানো দরকার। মন বলছে ঠিকই, কিন্তু শরীর উল্টো পথে। পা দুটো টেনে নিয়ে যাচ্ছে যেন কেউ। ফোকরের কাছে পৌছে মিজুক উঁকি দিল ভেতরে। এই লোকের সাহস আছে। এমন ভাবে উঁকি দিল যেন প্রতিদিন ওখানে যায়। নৈঃশব্দটা এখন আরো প্রকট হয়েছে। তিরতির করে পাতার কাঁপুনির শব্দও কানে বাজছে। মিজুকের দাঁত বেরিয়ে পড়লো বামদিকে কি যেন দেখে। আমাকে হাত ইশারায় ডাকলো। আমি বললাম, না তুমি যাও। আমি আছি এখানে। কিন্তু সে ধমকে উঠাতে আমাকে যেতে হলো। বামদিকে একটা ঝুরঝুরে কাঠের তক্তা, যেটা এককালে দরজা ছিল বলে মালুম হয়। লাথি দিয়েই ভেঙ্গে ফেলা যাবে।
মিজুক দেরী না করে দড়াম করে একটা লাথি দিলে মড়াৎ করে তক্তাটা ভেতরের দিকে পড়ে গেল। গীর্জার ভেতরে ভয়াবহ অন্ধকার। তিনদিকে জঙ্গলে ঘিরে পিষে ফেলছে। ভেতরে ভয়ংকর সাপখোপের আখড়া আছে নিশ্চয়ই। নিজেরা সাপ খেলেও সাপের কামড়ে ভয় ছিল। তাছাড়া তখনো সাপ ধরায় ততটা পাকা হইনি। ঢোঁড়া সাপ বাদে আর কোন সাপ ধরতে জানি না। কিন্তু মিজুকের হাতে যে ছুরি ওটা দিয়ে সাপের কল্লা ফেলে দিতে এক সেকেন্ডও লাগবে না। ভেতরে ঢুকে ম্যাচের কাঠি জ্বালালো। একটুকরো আলো কোনমতে হাসলো তার হাতের তালুতে। কিন্তু এত অল্প আলোয় সেই ভয়াবহ অন্ধকার দূর করার কোন ব্যবস্থা হলো না। মিজুক কোমর থেকে গামছা খুলে ফরফর করে ছিঁড়ে একটা ডালের আগায় বেধে দিল। হয়ে গেল একটা মশাল। এবার ভেতরের চেহারা ভেসে উঠলো। আশ্চর্য! গীর্জার ভেতরটা একদম ফাঁকা। চেয়ার টেবিল দেরাজ ড্রয়ার কিচ্ছু নেই। চারপাশে চারটা দেয়াল বাদে কোথাও কিচ্ছু নাই। কিন্তু মিজুক খুঁজতে থাকলো গুপ্তধন। সবগুলো দেয়ালে মেঝেতে টোকা দিল একে একে। কোথাও কিচ্ছু নাই দেখে পাগলামি শুরু করলো রীতিমতো। মশালের আলোটা উপর দিকে যেতে কিছু একটা চোখে পড়লো আমার। ছাদের বীম থেকে দড়িতে ঝুলছে একটা ঘড়ি। ওটা মিজুককে দেখাতেই তার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো খুশীতে। আমাকে কাঁধের উপর দাঁড় করিয়ে নামিয়ে আনলো ঘড়িটা। অল্প আলোয় ঘড়িটা দেখেই আমি ওটার প্রেমে পড়ে গেলাম। এত সুন্দর ঘড়ি হতে পারে? এটা যদি আমি পেতাম? কিন্তু এটা তো মিজুকের হবে। মিজুক এরকম দূর্লভ জিনিসের খোঁজেই এখানে এসেছে। ভেবেছে আরো অনেক কিছু পাবে যা বিক্রি করে বড়লোক হয়ে যাবে। ঘড়িটা নিয়েই বললো এটা ইন্ডিয়া পার করতে পারলে লাখ রুপেয়া! হা হা। শুনে আমি কেন যেন কেঁপে উঠলাম। আর কিছু না পেয়ে শুধু ঘড়িটা নিয়েই আমরা ফেরার পথ ধরলাম। ফেরার পথে মিজুকের সাথে দৌড়ে পারছি না। যেন উড়ে যাচ্ছে। চার পাঁচদিন এক নাগাড়ে হেটেছি। রাতে কোথাও ঘুমিয়ে পার করি, আর দিনের বেলায় হাঁটি। চারদিন হাঁটার পর এক জায়গায় এসে থামলাম। মিজুক আমাকে বললো, তুই এদিক দিয়ে গ্রামের পথে চলে যা, তিনদিন পশ্চিম দিকে হাঁটলেই চেনা পথ পাবি। এই ছড়া ধরে হেঁটে যাবি। আমি ইন্ডিয়া ঘুরে আসি। দাদাকে চিন্তা করতে বারন করিস। আমি ফিরলেই সুখবরটা দিবি। আমি মিজুকের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। নামতে নামতে ছড়ার কাছে নেমে পানিতে পা ছোঁয়াতেই পেছন থেকে মিজুকের তীব্র আর্ত চীৎকার। মাত্র কয়েকশো ফুট উপরে সে। কিন্তু চট করে ওঠা যায় না। উঠতে উঠতে চাচার দেহটা নিথর হয়ে গেল।

কানের ঠিক নীচে দুটো দাঁতের ছোবল। সাপে কেটেছে। মিজুকের শরীর ঝাঁকি দিলাম। কোন সাড়া নেই। কানের পাশে কিভাবে কামড়ে দিল বুঝলাম না। পাশেই পড়ে আছে ঘড়িটা। ওটা হাতে নিলাম। ঘড়িটার নীচের অংশে একটা দরোজা মতো। দরজায় একটা গোলাকার ছিদ্র। দরজাটা খুলতেই ভেতরে একটা ছোট্ট প্রকোষ্ঠ। সেখানে বিজাতীয় ভাষায় কি জানি লেখা আছে । এখানেই কি উড়কা সাপটা লুকিয়ে ছিল? সাপটা পালিয়ে গেছে। মিজুকের লাশটা নিয়ে কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। গ্রামে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কিছু ডালপালা কেটে তার নীচে চাপা দিলাম দেহটা। ফেরার পথে পা চলছিল না। ঘড়িটা হাতে ঝুলিয়ে ফিরছি। সবুজ বনানী আর পর্বতময় বিরান ভূমি। লোকবসতির কোন চিহ্ন নেই। ছড়া ধরে হাঁটা শুরু করলাম। মিজুক বলেছিল পশ্চিম দিকে হাঁটতে। কিন্তু আমি পশ্চিমে যাবার রাস্তা পাচ্ছি না। এই ছড়ার কোথাও না কোথাও মানব বসতি থাকে। পাহাড়ে পানির সংকট প্রবল। তাই সবগুলো পাড়া কোন না কোন নদী কিংবা ছড়ার ধারে। সন্ধ্যের মুখে মুখে রাত কাটাবার মতো একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজছি তখনই ডানদিকের পাহাড়ে একটা ধোঁয়ার রেখা দেখা গেল। মেঘ না ধোঁয়া?
আরো ভালো করে পরখ করলাম। নাহ ওটা ধোঁয়াই। ওদিকে পাড়া আছে হয়তো। ছড়া থেকে উঠে পা চালালাম দ্রুত। আঁধার নেমে আসছে দ্রুত। জোরে জোরে পা চালাতে গিয়ে খেয়াল করিনি আমার পেছনে কেউ আসছে। কাঁধের উপর কেউ হাত রাখতেই ছিটকে লাফ দিলাম ভয়ে। ফিরে দেখি বয়স্ক একজন মানুষ। চেহারা বলছে বম গোত্রের লোক। আলাপ হলো। পরিচয় হলো। ওরা খুব নম্র ভদ্র শান্তশিষ্ট অতিথি পরায়ন। কুরংখা আমাকে আশ্রয় দিতে রাজী হলো ওদের গ্রামে। ওই ধোঁয়া ওঠা গ্রামটা ওদেরই। গ্রামে গিয়ে পৌছে দেখি এরা আমার দেখা সবচেয়ে পশ্চাদপদ গোষ্ঠি। সভ্যতার কোন আলো প্রবেশ করেনি এখানে। অন্ধকার গ্রামে আর কোন ঘরবাড়ী দেখা গেল না। আরো ঘর আছে কিন্তু ওরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে বলে দেখা যাচ্ছে না। এই পাড়ায় একমাত্র কুরংখার ঘরেই সন্ধ্যের পর বাতি জ্বলে। কারণ তার ঘরে আশ্চর্যতম বস্তু হারিকেন আছে। পাড়ার সর্দার বলে সে এটা যোগাড় করেছে বহুদূরের বাজার থেকে। কুরংখার পাশের ঘরে থাকে ছোট ভাই আরাংখা। খাওয়া সেরে আরাংখা হুঁকো নিয়ে আসলো অতিথির সাথে গল্প করতে। গীর্জার গল্প সহ সব গল্পই হলো। ঘড়িটার গল্প করতে করতে হারিকেনের মৃদু আলোয় দেখা গেল, আরাংখা কেমন একটা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘড়িটার দিকে। তার দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে সে আমার কথাগুলো বিশ্বাস করেনি। ঠোটের কোনে তার ঝুলে থাকা হাসিটা ভালো লাগলো না। রাতে ঘুমোতে দেয়া হলো ঘরের সামনে মাচাং এর উপর। নীচে হাসমুরগীর ঘর। মাচার উপর শোয়াটা সুখের নয়। কিন্তু শোয়ামাত্র চোখ জড়িয়ে এলো সারাদিনের ক্লান্তিতে। খুব ভোরের দিকে কারো তীব্র চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আলো ফুটেছে মাত্র তখন। জেগে উঠে আধো অন্ধকারে দেখলাম পাড়ার সবাই ছুটে যাচ্ছে আরাংখার ঘরের দিকে। শব্দটা ওদিক থেকেই এসেছিল? আমিও গেলাম। দেখি আরাংখার নিথর দেহটা তার ঘরের সামনে পড়ে আছে চিত হয়ে। পাশেই আমার ঘড়িটা পড়ে আছে। ওটা ওখানে কি করে গেল? বুঝতে বাকী বইল না আরাংখা চুরি করেছে ওটা কাল রাতে। তারপর খেয়াল করে দেখলাম ওর কানের লতির ঠিক নীচে দুটো দাগ। সাপ!! এই সাপ এখানেও আছে? তার মানে সাপটা ঘড়িটার পিছু নিয়েছে? ভয়ে গা শির শির করে উঠলো আমার। আমাকে কোন দিন ছোবল দেয় ঠিক নাই। কি বিপদ। পাড়ার মধ্যে তুমুল হৈ চৈ চলছে, কে মারলো কেন মারলো। কিন্তু সে মরেছে নিজের দোষে। তাই কেউ আমার দোষ দিতে পারবে না। তবু কুরংখা আমাকে বললো, তুই এখনি চলে যা, তোর এই জিনিসটা অভিশপ্ত। পাড়ার লোকজন তোকে ভালো চোখে দেখছে না। তোর জিনিস নিয়ে তুই চলে যা।
আমি ঘড়িটা হাতে ঝুলিয়ে বের হয়ে গেলাম। কিছুদূর গিয়েই ছড়াটা পেলাম আবার। ছড়া ধরে মাইলখানেক যাবার পর একটা পেঁপে গাছ দেখলাম, বুনো পেঁপে ধরে আছে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছিল। একটা পাকা পেঁপে কেটে খেয়ে নিলাম। আর দুটো থলেতে ঝুলিয়ে নিলাম। অজ্ঞাত কারণে ঘড়িটা ফেলতে পারলাম না। যথেষ্ঠ সমীহ করে এগিয়ে চললাম। কিন্তু মনটা আশংকায় ছোট হয়ে রইল। দুদুটো মানুষ মরে গেল এই ঘড়ির জন্য। এটাকে ফেলে দিলে কি হয়। কিন্তু ফেলতে পারছি না। মনে ভয়ও তাড়াতে পারছি না। সাপটা নিশ্চয়ই গাছে গাছে অনুসরন করছে। এটা উড়কো সাপ। উড়কো সাপ গাছ থেকে গাছে লাফ দিয়ে চলে। তিনদিন হাঁটার পর চেনা পথের সন্ধান পাওয়া গেল। এখান থেকে দেড় দিন হাঁটলেই আমাদের গ্রাম। বাকী রাস্তায় আর কোন সমস্যা হলো না। নিরাপদে বাড়ী ফেরা হলো। সেই থেকে ঘড়িটা আমার সাথে আছে।
............................................................................
ধনুর গল্প শেষ। রাত কতো এখন? ভোর হয়ে আসছে নাকি? শীতের তান্ডবে হাড় মজ্জা সব এক হয়ে যাচ্ছে। এবার বুঝলাম ধনু নাপ্পি খাওয়ার জন্য এত উতলা হয়েছিল কেন। নাক কান সব টুপিতে ঢেকে শুয়ে পড়লাম। সকালে জাগলাম অনেক বেলা করে। সূর্য উঠে গেছে। ধনু তখনো ঘুমে। মাথার ওপর ঝোলানো ঘড়িটা দেখলাম। কৌতুহল চাপতে না পেড়ে ঘড়িটা নামিয়ে দেখতে লাগলাম উল্টে পাল্টে। কাঠের কারুকাজের মধ্যে ছোট্ট একটা লাইন দেখে পড়তে চেষ্টা করলাম। ভাষাটা চেনা মনে হচ্ছে! লেখা আছে-
me ver, me adore, acredite em mim, ou morrer
পর্তূগীজ ভাষার একটা সতর্কতা। কিন্তু কেন? শিরশিরে অনুভুতিতে ডান হাতটা আপনাআপনিই ডান কানের লতির নীচটা স্পর্শ করলো।
                                                                                                                           লিখেছেন: নীড় সন্ধানী
                                                                                                   ভয়ঙ্কর , রোমহর্ষক এবং শ্বাসরুদ্ধকর সব গল্প